পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় টিউশনিতে যাওয়ার পথে জবি ছাত্রদল নেতা জুবায়েদ হোসাইন হত্যা—এমন ভয়াবহ ছুরিকাঘাতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ক্যাম্পাস ও আশেপাশে। রোববার, ১৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় পানির পাম্প গলির একটি ভবনের সিঁড়ি থেকে এই শিক্ষার্থীর রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। বংশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, “আরমানিটোলার পানির পাম্প গলির একটি বাসা থেকে জুবায়েদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।”
নিহত জুবায়েদ হোসাইন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫তম আবর্তনের এই শিক্ষার্থী ছাত্র রাজনীতির পাশাপাশি কুমিল্লা জেলা ছাত্র কল্যাণ/সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করছিলেন বলে সহপাঠীরা জানিয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, জুবায়েদ প্রতিদিনই ওই এলাকায় টিউশনিতে যেতেন; ঘটনার দিন সন্ধ্যায় তিনতলার সিঁড়িতেই তার রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
ঘটনার পরপরই ভবনটির সামনের সড়কে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন জবি’র বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, ছাত্রদলের নেতাকর্মীসহ সহপাঠীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের এক নেতা অভিযোগ করেন, “নিচতলা থেকে তিনতলা পর্যন্ত রক্ত ছিল, তবু ভবনের ভাড়াটিয়ারা কোনো তথ্য দিচ্ছেন না—এটি সন্দেহজনক। এটি পরিকল্পিত হত্যা হতে পারে।” প্রতিবাদকারীরা দ্রুত ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে স্লোগান দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক ঘটনাটিকে “অত্যন্ত মর্মান্তিক ও অস্বাভাবিক” অভিহিত করে বলেন, “পুলিশকে আশপাশের সব সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের অনুরোধ করা হয়েছে। আমি ঘটনাস্থলে যাচ্ছি।” প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন জানান, পাশের একটি ভবনের সিসিটিভিতে পেছন দিক থেকে দুইজনকে দৌড়ে পালাতে দেখা গেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে; তবে হত্যার পেছনে ব্যক্তিগত শত্রুতা নাকি অন্য কোনো কারণ—সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: খুলনা জেলা কারাগারে সংঘর্ষ: জরুরি পদক্ষেপে ৩ জন কাশিমপুরে
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যে বাসায় জুবায়েদ টিউশনিতে যেতেন, সেখানেই তার লাশ উদ্ধার করা হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের সময় ভবনের অভ্যন্তরে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা সক্রিয় ছিল না—এ বিষয়টি তদন্তের জন্য “বিস্ফোরক” ইঙ্গিতবাহী বলে মনে করছেন অনেকে। এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ভুক্তভোগীকে হয়তো ডেকে এনে ওপরতলায় হামলা করা হয়; এরপর সিঁড়িতেই তিনি লুটিয়ে পড়েন। তবে এসব বক্তব্যের কোনোটি এখনো পুলিশি তদন্তে যাচাই হয়নি।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে রিপোর্টের আলোকে হত্যার ধরন, অস্ত্রের প্রকৃতি ও শরীরের ক্ষতের প্যাটার্ন সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, “ফরেনসিক রিপোর্ট, ডিজিটাল প্রমাণ এবং আশপাশের ফুটেজ যাচাই সাপেক্ষে ঘটনাটির মোটিভ—ব্যক্তিগত, সামাজিক বা রাজনৈতিক—নির্ধারণ করা হবে।”
এ হত্যাকাণ্ডে জবি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এলাকায় অতিরিক্ত টহল, টিউশনির বাসা-বাড়িগুলোতে ভাড়াটিয়া তথ্য হালনাগাদ, এবং নিকটস্থ সড়কে সিসিটিভি কভারেজ বৃদ্ধির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কড়া সতর্কবার্তা ও সুপারিশ জানানোর কথা বিবেচনা করছে বলে ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে।