আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ত্রিশটির বেশি ইউনিট ছয় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। বিমানবন্দরের সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবাহ মুহূর্তেই থমকে পড়ে। কার্গো কমপ্লেক্সের ভেতরে সংরক্ষিত ছিল তৈরি পোশাক, ওষুধ, কৃষিপণ্য, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল—যার একটি বড় অংশই রপ্তানি বা পুনঃরপ্তানির জন্য প্রস্তুত ছিল।
আন্তর্জাতিক এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি কবির আহমেদ খান বলেন, “এই মুহূর্তে সরাসরি ক্ষতির সঠিক হিসাব করা অসম্ভব, তবে আমদানি-রপ্তানিতে যে বড় ধরনের ধাক্কা আসছে, তা এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে।” তিনি আরও জানান, এই ক্ষতির মধ্যে শুধু পণ্য হারানোর অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং সময়মতো ডেলিভারি দিতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল, মূল্যছাড় এবং দ্রুত বিকল্প চালানের খরচও যুক্ত হবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সভাপতি ফজলী শামীম এহসান বলেন, “আমরা আশঙ্কা করছি শুধু গার্মেন্টস খাতেই রপ্তানির ক্ষতি এক বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে। কারণ এই শিল্পটি সময় ও নির্ভরযোগ্যতার উপর টিকে আছে। যখন কাঁচামাল দেরিতে আসে, তখন একটি ছোট অংশের ক্ষতিও পুরো চালান বাতিলের কারণ হতে পারে।”
কার্গো ভিলেজে থাকা বেশিরভাগ পণ্যই ছিল ছোট কনসাইনমেন্ট—গার্মেন্টস স্যাম্পল, এক্সেসরিজ, যন্ত্রাংশ, ডকুমেন্টস ও পার্সেল। এগুলোর প্রতিটি পণ্য যদিও আকারে ছোট, কিন্তু সম্মিলিতভাবে তা দেশের রপ্তানি শিল্পের জন্য অমূল্য সম্পদ। ফজলী শামীম এহসান বলেন, “ধরা যাক আমার পণ্য মাত্র দুই হাজার ডলারের, কিন্তু সেটি যদি না আসে, তাহলে আমি দুই লাখ ডলারের রপ্তানি পাঠাতে পারব না। কারণ সেই ছোট অ্যাক্সেসরিজই পুরো পণ্যের চেইন থামিয়ে দেয়।”
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সহসভাপতি মো. শহাব উদ্দুজা চৌধুরী জানান, “আমরা ইতিমধ্যে সদস্যদের কাছে ইমেইল পাঠিয়েছি, কার কার পণ্য ওই কার্গো এলাকায় ছিল এবং কত মূল্যমানের ক্ষতি হয়েছে তার বিস্তারিত জানতে। এই প্রভাব শুধুমাত্র গার্মেন্টস নয়, ফার্মাসিউটিক্যালস ও অন্যান্য খাতেও পড়বে।”
একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, কার্গো ভিলেজে সংরক্ষিত ছিল আমদানিকৃত কাঁচামাল, যেগুলো মূলত দ্রুত উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল। একজন উদ্যোক্তা জানান, “আমি ভারতের কলকাতা থেকে প্রায় ৪০ কেজি লেস অ্যাক্সেসরিজ এনেছিলাম একটি জরুরি চালানের জন্য। আমার ক্লিয়ারিং এজেন্ট বলছে, ৯৮ শতাংশ সম্ভাবনা আছে পণ্যগুলো পুড়ে গেছে। ওই চালান না পৌঁছালে ১ লাখ ৬২ হাজার ডলারের রপ্তানি বাতিল হবে।”
কার্গো ভিলেজে শুধু গার্মেন্টস নয়, ওষুধ কোম্পানির কাঁচামালও ছিল। এক ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি জানান, “আমার প্রায় ৭৫ হাজার ডলারের কেমিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট নষ্ট হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার ছাড় করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারিনি। রবিবার ছাড় করার কথা ছিল—সব শেষ।”
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগুনটি শুরু হয় কুরিয়ার সার্ভিস বিভাগের একটি অংশে, যেখানে শতাধিক আন্তর্জাতিক কুরিয়ার অপারেটর তাদের পণ্য সংরক্ষণ করে থাকে। ধারণা করা হচ্ছে, একটি বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়, যা দ্রুত পুরো গুদামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে গার্মেন্টস খাতের অবদান প্রায় ৮৪ শতাংশ। গত অর্থবছরে শুধু পোশাক রপ্তানি থেকেই আয় হয়েছিল প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। ফলে এই ঘটনার পরপরই বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিজিএমইএ বলছে, দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার পরিকল্পনা না নিলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার স্থানান্তর করতে পারে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগুনের সরাসরি ক্ষতির পাশাপাশি আরও বড় প্রভাব পড়বে সময়ের অপচয় ও আস্থার সংকটে। কার্গো অপারেশন বন্ধ থাকায় হাজারো চালান আটকে গেছে, যার ফলে রপ্তানিকারকদের জরুরি চালান বিমানে পাঠাতে হবে—যার খরচ স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে চারগুণ বেশি। এই অতিরিক্ত ব্যয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা কঠিন করে তুলবে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, বিমানবন্দর কার্গো ভিলেজের মতো একটি সংবেদনশীল স্থানে পর্যাপ্ত অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা দেশের জন্য বড় সতর্কবার্তা। এখনই যদি কর্তৃপক্ষ দ্রুত অবকাঠামো পুনর্গঠন, বিমা দাবি নিষ্পত্তি এবং ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণের পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানিতে দৃশ্যমান হবে।
এদিকে, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে আরও কয়েকদিন লাগবে। তারা বলেছে, “আমরা কার্গো এলাকার প্রতিটি অংশ স্ক্যান করছি, যাতে কোনো বিপজ্জনক পদার্থ থেকে পুনরায় আগুনের ঝুঁকি না থাকে।”
এই অগ্নিকাণ্ডের পর দেশের বাণিজ্য খাতে নেমে এসেছে গভীর অনিশ্চয়তা। তৈরি পোশাক খাতের নেতারা বলছেন, ক্ষতির এই ধাক্কা সাময়িক নয়; এটি পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকেই পুনর্গঠন করতে বাধ্য করবে। আর সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ না এলে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকার এই বিমানবন্দর অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও ঝুঁকির এক কঠিন স্মারক। আগুন নেভানো সম্ভব হলেও যে আর্থিক আগুন জ্বলে উঠেছে, তা নিভাতে সময় লাগবে অনেক।
One thought on "ঢাকা বিমানবন্দরের আগুনে ১০০ কোটি ডলারের রপ্তানি বিপর্যয়: ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা নতুন বাণিজ্য সঙ্কট"