নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা | ২১ অক্টোবর ২০২৫
তিস্তা নদী পুনরুজ্জীবন ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন–এর দাবিতে ঢাকা কলেজ প্রাঙ্গণ সোমবার (২০ অক্টোবর) রাতে উত্তাল হয়ে ওঠে। নর্থ বেঙ্গল স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা কলেজ-এর উদ্যোগে আয়োজিত মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশে রাজশাহী ও রংপুর—উত্তরবঙ্গের দুই বিভাগের ১৬ জেলার জেলা ছাত্রকল্যাণ সমিতির নেতারা ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। আয়োজকরা জানান, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা শতাধিক থেকে হাজার ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে দাবি উঠলেও, মূল বার্তা ছিল এক—তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও ন্যায্য পানির হিস্যা এখনই নিশ্চিত করতে হবে।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, “উত্তরবঙ্গের জীবন ও জীবিকা তিস্তার ওপর নির্ভরশীল। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন মানে কৃষককে বাঁচানো, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।” শিক্ষার্থীরা স্লোগানে মুখর ঢাকায় জানান—‘তালবাহানা নয়, এখনই তিস্তা বাস্তবায়ন চাই’, ‘তিস্তা বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’। বিক্ষোভ শেষে মশাল নিয়ে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাস ও সায়েন্সল্যাব পর্যন্ত পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।

ঢাকা কলেজে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মশাল মিছিল
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক পিয়াল হাসান, যুগ্ম আহ্বায়ক রাকিবুল ইসলাম রাকিবসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি—ছাত্রশিবির, বাম ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাগছাস, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ ও অন্যান্য প্রগতিশীল সংগঠনের নেতারা। উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার জেলা ছাত্রকল্যাণ সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা একযোগে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নকে “সময়ের দাবি” হিসেবে তুলে ধরেন।
সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী কামাল আহমেদ আনোয়ার। তিনি বলেন, “চীনের দুঃখ হোয়াংহো, আর বাংলাদেশের দুঃখ তিস্তা। এ প্রকল্প বিলম্বিত হলে তা হবে পুরো জাতির জন্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়।” তিনি আরও যোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের “বড় বড় কথা” থাকা সত্ত্বেও বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়; তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে নভেম্বরের মধ্যে ঢাকাজুড়ে বৃহত্তর মশাল মিছিলসহ কঠোর কর্মসূচির ইঙ্গিত দেন।
বক্তারা অভিযোগ করেন, সীমান্তঘেঁষা অববাহিকাজুড়ে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে খরা, বর্ষায় আকস্মিক প্লাবন—দুই চাপে পড়ছেন কৃষকরা। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক নদীবণ্টন চুক্তির ন্যূনতম মান রক্ষা করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন–সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো, রিভার ট্রেনিং, বাঁধ-খাল সংস্কার, আধুনিক সেচব্যবস্থা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।
ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক পিয়াল হাসান বলেন, “উত্তরবঙ্গকে আলাদা করে দেখার কোনো কারণ নেই। উত্তরবঙ্গের মাঠে যে ফসল হয়, তার সুফল ভোগ করে পুরো দেশ। তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন জাতীয় স্বার্থেই জরুরি।”
বক্তাদের বক্তব্যে একাধিকবার উঠে আসে, “সরকার যদি দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করে, শিক্ষার্থীরা আরও কঠোর আন্দোলনের ডাক দিতে বাধ্য হবে।” কয়েকজন ছাত্রনেতা বলেন, “তিস্তা নিয়ে তালবাহানা চলবে না; ন্যায্য হিস্যা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে অবিলম্বে দৃশ্যমান রূপরেখা চাই।” তারা প্রশাসনকে ‘কড়া সতর্কবার্তা’ দিয়ে জানান, দীর্ঘসূত্রতা অব্যাহত থাকলে আন্দোলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
সমাবেশে উপস্থাপিত বক্তৃতায় বলা হয়, তিস্তার শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় রবি ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়; বর্ষায় অতিপ্রবাহে বাঁধ ভাঙা, ফসলহানি ও গৃহহানি ঘটে। শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন–ভিত্তিক সমন্বিত জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা চালু হলে সারা বছরে ভারসাম্যপূর্ণ সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে, যা খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করবে।
নর্থ বেঙ্গল স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা কলেজ জানায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিক কর্মসূচি চলবে। তারা জাতীয় পর্যায়ে দাবি তোলা, বিশেষজ্ঞ–শ্রবণ, তথ্যভিত্তিক জনসচেতনতা ও রাজধানীকেন্দ্রিক বৃহত্তর সমাবেশ—এসব পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। এক বিবৃতিতে সংগঠনের নেতারা বলেন, “তিস্তা শুধু উত্তরবঙ্গের দাবি নয়—এটি বাংলাদেশের প্রাণের দাবি।”