পৃথক পাঁচ মামলায় জামিন চেয়ে করা সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের আবেদনগুলোর শুনানির জন্য আজ রবিবার (২৬ অক্টোবর) দুপুর সোয়া দুইটার সময় নির্ধারণ করেছেন হাইকোর্ট।
আজ সকালে বিচারপতি এ এস এম আবদুল মোবিন ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই সময় নির্ধারণ করেন।
তিন মাস ধরে কারাগারে থাকা সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক পাঁচটি মামলায় নিম্ন আদালতে জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর পৃথকভাবে হাইকোর্টে জামিনের জন্য আবেদন করেন।
২০ অক্টোবর আবেদনগুলো শুনানির জন্য উত্থাপন করা হলে আদালত সেদিনই ২৬ অক্টোবরের কার্যতালিকায় রাখার নির্দেশ দেন। সেই ধারাবাহিকতায় আজ কার্যতালিকার ৯৮২ থেকে ৯৮৬ নম্বর ক্রমিকে মামলাগুলো ওঠে।
আজ সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী আদালতে বিষয়টি উপস্থাপন করে বলেন, “পাঁচটি মামলায় খায়রুল হক সাহেবের জামিন আবেদন কার্যতালিকার ৯৮২ থেকে ৯৮৬ নম্বরে রয়েছে। আজই শুনানির জন্য বিষয়টি নির্ধারণের অনুরোধ করছি।”
তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী এম কামরুল হক সিদ্দিকী ও মোনায়েম নবী শাহীন।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুলতানা আক্তার রুবী। তিনি আদালতকে জানান, “দুপুর দুইটার পর শুনানি নেওয়া যেতে পারে।” পরে আদালত সময় নির্ধারণ করেন দুপুর সোয়া দুইটা।
আরো পড়ুনঃধর্মীয় বিভাজন বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে: তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম
এ বি এম খায়রুল হক ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় দেন, যার ফলে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়।
এই রায়ের পর থেকেই তিনি রাজনৈতিক ও আইন-আলোচনায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন।
দীর্ঘদিন আলোচনার বাইরে থাকার পর গত ২৪ জুলাই পুলিশ রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করে।
পরে তাঁকে জুলাই আন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়ীতে যুবদল কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এরপর তাঁকে আরও কয়েকটি মামলায় অভিযুক্ত করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে:
1️⃣ বেআইনি রায় ও জাল রায় তৈরির অভিযোগে নারায়ণগঞ্জে করা মামলা (২৫ আগস্ট ২০২৪)
2️⃣ তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত রায় জালিয়াতির অভিযোগে শাহবাগ থানায় মামলা (২৭ আগস্ট ২০২৪)
3️⃣ একই অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায় মামলা (২৫ আগস্ট ২০২৪)
4️⃣ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলা—বিধিবহির্ভূতভাবে প্লট গ্রহণের অভিযোগে
এই মামলাগুলোতে নিম্ন আদালতে জামিন নাকচ হওয়ার পর তিনি পৃথকভাবে হাইকোর্টে আবেদন করেন।
খায়রুল হকের পক্ষে আইনজীবীরা বলেন, “এই মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন। সাবেক প্রধান বিচারপতির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে এসব মামলা করা হয়েছে।”
তাঁরা আদালতের কাছে তাঁর জামিন মঞ্জুরের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, খায়রুল হকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এবং তাঁর মুক্তি তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
খায়রুল হকের জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে আইনজীবী মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেক আইনজীবী মনে করছেন, এই মামলার ফলাফল ভবিষ্যতে বিচার বিভাগে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বাধীনতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করবে।
আদালতের আশেপাশে আজ সকালে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সাংবাদিক ও সাধারণ দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা গেছে সুপ্রিম কোর্ট এলাকায়।
২০১১ সালে খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ যখন ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে, তখন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তির ফলে পরবর্তী নির্বাচনগুলো সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়, যা রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেয়।
এই রায় নিয়েই পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে ‘রায় জালিয়াতি’ ও ‘বেআইনি প্রভাব খাটানো’র অভিযোগ ওঠে, যা আজকের মামলাগুলোর অন্যতম ভিত্তি।
দুপুর সোয়া দুইটায় শুনানির সময় নির্ধারিত থাকায় আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে এখন দেশের আইনজীবী সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নজর রাখছেন।
আদালত আজ তাঁর জামিন মঞ্জুর বা নাকচ—যে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
যদি জামিন মঞ্জুর হয়, তবে খায়রুল হক দীর্ঘ তিন মাস পর কারাগার থেকে মুক্ত হতে পারেন। অন্যদিকে, আদালত যদি জামিন না দেন, তবে তাঁর কারাবাস আরও দীর্ঘায়িত হবে।