নখ কামড়ানো উত্তেজনা, রোমাঞ্চ আর অবিশ্বাস্য নাটকীয়তায় ভরা এক ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ১ রানের পরাজয় বরণ করলো বাংলাদেশ। মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে নির্ধারিত ৫০ ওভারের ম্যাচ ‘টাই’ হয়। এরপর ওয়ানডে ক্রিকেটে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম সুপার ওভারে বাংলাদেশের হার নিশ্চিত হয়। এই জয়ে সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজ তিন ম্যাচের সিরিজে ১-১ সমতা ফেরালো।
এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ জয়ের মিশনে নেমেছিল স্বাগতিকরা। ২১৩ রানের পুঁজি নিয়ে একটা সময় জয় দেখছিল বাংলাদেশ। কিন্তু শেই হোপের (৫৩*) লড়াকু ফিফটিতে ম্যাচ গড়ায় শেষ ওভারের উত্তেজনায়।
রুদ্ধশ্বাস শেষ ওভার ও ‘টাই’
ম্যাচের শেষ অঙ্ক ছিল অবিশ্বাস্য। জয়ের জন্য শেষ ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রয়োজন ছিল মাত্র ৫ রান, হাতে ২ উইকেট। অধিনায়ক মিরাজ বল তুলে দেন পার্ট টাইম বোলার সাইফ হাসানের হাতে।
সাইফ প্রথম দুই বলে আকিল হোসেনকে ডট দিলে স্টেডিয়ামে উত্তেজনার পারদ চড়ে। তৃতীয় ও চতুর্থ বলে সিঙ্গেল নিলে সমীকরণ দাঁড়ায় দুই বলে তিন রান। পঞ্চম বলে সাইফ হাসান দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে আকিল হোসেনকে বোল্ড করলে বাংলাদেশের জয়ের আশা উজ্জ্বল হয়।
শেষ বলে প্রয়োজন ৩ রান। নতুন ব্যাটার খারি পিয়েরে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন। কিন্তু উইকেটরক্ষক নুরুল হাসান সোহান স্কয়ার লেগে দৌড়েও সেই সহজ ক্যাচ তালুবন্দী করতে পারেননি। উল্টো দুই ব্যাটার দৌড়ে ২ রান নিয়ে নিলে ম্যাচটি টাই হয়ে যায়। দুই দলের ইনিংস থামে ২১৩ রানে।
সুপার ওভারের নাটকীয়তা
খেলা গড়ালে সুপার ওভারে প্রথমে ব্যাট করতে নামে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বাংলাদেশের হয়ে বল করেন মুস্তাফিজুর রহমান।
প্রথম বলে ১ রান নেওয়ার পর দ্বিতীয় বলে শেরফান রাদারফোর্ডকে সাইফ হাসানের ক্যাচে পরিণত করেন ফিজ। তৃতীয় বলে নতুন ব্যাটার ব্রেন্ডন কিং নেন ২ রান। চতুর্থ বলে কিংয়ের তোলা ক্যাচ কভারে ধরতে পারেননি অধিনায়ক মিরাজ, আসে ১ রান। পঞ্চম বলে ২ রান এবং শেষ বলে হোপের ব্যাটের কানায় লেগে বাউন্ডারি হলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ দাঁড়ায় ১০ রান। জয়ের জন্য বাংলাদেশের লক্ষ্য দাঁড়ায় ১১।
জবাবে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনার আকিল হোসেনের করা প্রথম বলটিই ওয়াইড হয়। পরের বলটি ‘নো’ ডাকেন আম্পায়ার এবং তাতে সৌম্য সরকার ২ রান নেন। ফ্রি হিটে আসে আরও ১ রান। ফলে কোনো বৈধ বল খেলার আগেই বাংলাদেশের ঝুলিতে জমা হয় ৫ রান।
সমীকরণ দাঁড়ায় ৬ বলে ৬ রান। কিন্তু এরপরই খেই হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় বলে (প্রথম বৈধ বল) স্ট্রাইকে থাকা সাইফ হাসান ডট দেন। তৃতীয় বলে নেন ১ রান। চতুর্থ বলে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে ডিপ স্কয়ার লেগে ক্যাচ দেন সৌম্য সরকার। ২ বলে যখন ৫ রান প্রয়োজন, তখন নাজমুল হোসেন শান্ত ১ রান নেন। আকিল এরপর একটি ওয়াইড দিলেও শেষ বলে মাত্র ১ রান আসায় ৯ রানেই থেমে যায় বাংলাদেশের ইনিংস।সুপার ওভারে বাংলাদেশের হার নিশ্চিত হয়।
রিশাদের ঝড় ও বাংলাদেশের ইনিংস
এর আগে টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে শুরুটা ভালো হয়নি। ৪১ রানের মধ্যেই সাইফ হাসান (৬) ও তাওহিদ হৃদয় (১২) ফিরে যান। নাজমুল হোসেন শান্ত (১৫) ও মাহিদুল অঙ্কন (১৭) থিতু হতে পারেননি।
দলীয় সর্বোচ্চ ৮৯ বলে ৪৫ রান করেন সৌম্য সরকার। তবে তার ধীরগতির ব্যাটিং দলকে চাপে ফেলেছিল। একটা সময় ১৩০ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ২০০ রান নিয়েই শঙ্কা জাগে।
সেখান থেকে নুরুল হাসান সোহান (২৩) ও অধিনায়ক মিরাজ (৫৮ বলে ৩২*) প্রতিরোধ গড়েন। তবে বাংলাদেশের ইনিংসকে ২১৩ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার মূল কারিগর রিশাদ হোসেন। শেষ দিকে ক্রিজে এসে রীতিমতো ঝড় তোলেন এই অলরাউন্ডার। ৩টি চার ও ৩টি ছক্কার সাহায্যে মাত্র ১৪ বলে ৩৯ রানের এক বিস্ফোরক ক্যামিও খেলেন তিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষে গুড়াকেশ মোতি নেন তিনটি উইকেট।
যেভাবে ম্যাচে ফেরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ
২১৩ রানের পুঁজি নিয়ে বোলিংয়ে নেমে বাংলাদেশের স্পিনাররা শুরু থেকেই দাপট দেখান। নাসুম আহমেদ প্রথম ওভারেই ব্রেন্ডন কিংকে ফেরান। ১৩৩ রানেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের সপ্তম উইকেট তুলে নেয় বাংলাদেশ। রিশাদ হোসেন ৩টি এবং নাসুম ও তানভীর ২টি করে উইকেট নেন।
তবে সেখান থেকে জাস্টিন গ্রিভসকে (২৬) নিয়ে অষ্টম উইকেটে ৪৪ রানের জুটি গড়েন শেই হোপ। মিরাজের দুর্দান্ত এক থ্রোতে গ্রিভস রান আউট হলেও হোপ একাই ম্যাচটিকে শেষ ওভার পর্যন্ত নিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত টাই করে দলকে সুপার ওভারে নিয়ে যান।
আরও পড়ুনঃ ক্রিকেট পর্যটন উন্নয়নে বিসিবির সাথে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর