দীর্ঘ আলোচনার পর চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে জুলাই জাতীয় সনদ, তবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও সময়সীমা নিয়ে এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়নি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জানিয়েছে, তারা সনদ বাস্তবায়নের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার বিষয়ে ভাবছে—যাতে আগামী সংসদ গঠনের ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান–সংক্রান্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা যায়।
কমিশনের সূত্র জানায়, সময়সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব এখনো আলোচনাধীন এবং প্রয়োজনে এটি বাড়ানো বা কমানো হতে পারে। কমিশন মনে করে, নির্দিষ্ট সময় না বেঁধে দিলে আগামী সংসদ পুরো মেয়াদজুড়েই সংস্কারের কাজ ঝুলিয়ে রাখতে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আগে গণভোট আয়োজনের বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। তবে কমিশন মনে করছে, গণভোট করার আগে একটি বিশেষ আদেশ (Special Order) জারি করতে হবে, যা গণভোটের আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এ প্রস্তাব ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জানানো হয়েছে।
কমিশন চায়, গণভোটের সময় ও পদ্ধতি নির্ধারণের দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের ওপরই থাকুক।
বিএনপি চাইছে জাতীয় নির্বাচনের দিনই আলাদা ব্যালটে গণভোট আয়োজন করতে। তারা মনে করে, এতে সময় ও ব্যয়ের সাশ্রয় হবে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) চায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই গণভোট সম্পন্ন হোক।
বামপন্থী দলগুলো যেমন—সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ জানিয়েছে, তারা আপত্তিসহ জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে না। এসব দল সনদের মূলনীতিতে থাকা পরিবর্তনের প্রস্তাব, বিশেষ করে বিদ্যমান চার মূলনীতি (জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা) বাদ দেওয়ার বিরোধিতা করছে।
অন্যদিকে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি সনদে স্বাক্ষরে নীতিগতভাবে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে, তবে তারা চূড়ান্ত ভাষ্য ও বাস্তবায়নের সুপারিশ দেখে সিদ্ধান্ত নেবে।
আগে ১৫ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ স্বাক্ষরের কথা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্য কমাতে এবং গণভোটের বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার করতে অনুষ্ঠানটি পিছিয়ে ১৭ অক্টোবর (শুক্রবার) নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, “দলগুলোর বক্তব্য আমরা আমলে নিয়েছি। সনদে ভিন্নমতগুলো সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হবে। ফলে দলিলটি রাজনৈতিকভাবে স্বচ্ছ থাকবে এবং আশা করি, সব দলই শেষ পর্যন্ত সনদে স্বাক্ষর করবে।”
প্রথমে কমিশন ভাবছিল দুটি প্রশ্নে গণভোট নেওয়ার—একটিতে ঐকমত্য প্রস্তাব, অন্যটিতে ভিন্নমত প্রস্তাব। তবে এখন কমিশন একটি প্রশ্ন রাখার প্রস্তাব বিবেচনা করছে:
“আপনি কি পুরো জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন চান?”
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই কমিশন সংসদ গঠনের পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধানসংক্রান্ত সংস্কার সম্পন্ন করার সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করছে।”
গত কয়েকদিনে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গে একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছে ঐকমত্য কমিশন। এসব বৈঠকে দলগুলোর অবস্থান পুরোপুরি না বদলালেও আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য কিছুটা কমেছে বলে কমিশনের আশা।
কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা দ্রুত সনদ বাস্তবায়নের উপায় চূড়ান্ত করে সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দেবে।
আগামী ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
3 thoughts on "জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন বিতর্ক, সময়সীমা ঠিক করতে পারছে না রাজনৈতিক মহল"