জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতীক তোমিইচি মুরায়ামা শুক্রবার সকালে দক্ষিণ-পশ্চিম জাপানের ওইতা শহরের একটি হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত জটিলতায় মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ১০১ বছর।
তিনি ছিলেন জাপানের ইতিহাসে প্রথম এবং একমাত্র সমাজতন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী—যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শান্তি, অনুশোচনা ও মানবতার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
১৯২৪ সালে জাপানের কিউশু দ্বীপের ওইতা জেলায় জন্ম নেওয়া মুরায়ামা টোকিওর মেইজি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরে ১৯৭২ সালে প্রথমবারের মতো প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে জাপানের সমাজতান্ত্রিক দলের নেতৃত্ব দেন।
১৯৯৪ সালে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি), সমাজতান্ত্রিক দল ও নিউ পার্টি সাকিগাকে মিলে গঠিত জোট সরকারের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী হন মুরায়ামা। মাত্র দুই বছরের শাসনকাল হলেও তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন তাঁর **‘মুরায়ামা বিবৃতি’**র জন্য।
১৯৯৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের ৫০তম বার্ষিকীতে, মুরায়ামা জাপানের আগ্রাসী নীতি ও ঔপনিবেশিক শাসনের জন্য “গভীর অনুতাপ ও আন্তরিক ক্ষমা” প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন,
“জাপান তার ঔপনিবেশিক শাসন আর আগ্রাসনের মাধ্যমে অনেক দেশের, বিশেষ করে এশিয়ার জনগণের বিরাট ক্ষতি ও দুঃখের কারণ হয়েছে।”
এই বিবৃতি পরবর্তীতে জাপানের যুদ্ধ-সম্পর্কিত ক্ষমাপ্রার্থনার মানদণ্ডে পরিণত হয়, যা আজও “মুরায়ামা বিবৃতি” নামে পরিচিত। এমনকি প্রধানমন্ত্রী জুনিচিরো কোইজুমি ও অন্যান্য উত্তরসূরিরা পরবর্তী বার্ষিকীতেও সেই ভাষা অনুসরণ করেন।
চীন সফরের সময় মুরায়ামা বলেন,
“ইতিহাসের মুখোমুখি হোন এবং জাপান ও চীনের মধ্যে চিরস্থায়ী শান্তি ও বন্ধুত্ব স্থাপন করুন।”
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁকে “চীনা জনগণের পুরনো বন্ধু” হিসেবে অভিহিত করে জানায়, তাঁর নেতৃত্ব দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
মুরায়ামার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে জাপান ভয়াবহ দুটি দুর্যোগের মুখোমুখি হয়—১৯৯৫ সালের কোবে ভূমিকম্প এবং টোকিও মেট্রোর সারিন গ্যাস হামলা। উভয় দুর্যোগে শতাধিক মানুষ নিহত হন, কিন্তু তিনি ধৈর্য ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিস্থিতি সামাল দেন।
মৃত্যুর আগে জাপানের বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা বলেন,
“মুরায়ামা ছিলেন সত্যিকার অর্থে শান্তির দূত। তিনি ইতিহাসের ভুল স্বীকার করতে পেরেছিলেন, যা একজন নেতার সবচেয়ে বড় সাহস।”
তোমিইচি মুরায়ামা শুধু জাপানের নয়, সমগ্র এশিয়ার ইতিহাসে শান্তি, অনুশোচনা ও মানবতার প্রতীক হয়ে থাকবেন।