পবিত্র আল-আকসা মসজিদে দখলকৃত জেরুজালেমের হৃদয়ে অবস্থিত আজ আবারও ফিলিস্তিনিদের অবিচল ঈমান, সংগ্রাম ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রায় দুই মাসের বন্ধের পর এই প্রথমবারের মতো হাজার হাজার মুসল্লি শুক্রবারের নামাজে অংশ নেন। করোনা-পরবর্তী বিধিনিষেধ ও ইসরায়েলি দমননীতি সত্ত্বেও প্রায় ৫০,০০০-এরও বেশি মুসল্লি মসজিদের চত্বরে সমবেত হন—যা এক অনন্য দৃশ্য তৈরি করে বিশ্ব মুসলিম সমাজে আলোড়ন তোলে।
জেরুজালেম, ২৪ জানুয়ারি ২০২৫
এই মসজিদ ইসলাম ধর্মের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান, মক্কা ও মদিনার পরেই যার মর্যাদা। এখানে নবী মুহাম্মদ (সা.) মিরাজের রাতের নামাজ আদায় করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তাই এই মসজিদ শুধু ইবাদতের স্থান নয়, বরং মুসলমানদের আত্মিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শুক্রবার সকালে ভোর থেকেই হাজার হাজার মানুষ ইসরায়েলি সামরিক চেকপয়েন্ট অতিক্রম করে পবিত্র স্থানটির দিকে ছুটে আসতে শুরু করেন। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ ছোট ছোট দলে গাড়ি বা বাসে করে। বহুজনকে পথেই থামানো হয়, পরিচয়পত্র যাচাই করা হয়, অনেকে আবার প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েই নামাজ পড়ে নেন।
জেরুজালেম ও আল-আকসা সংলগ্ন এলাকায় শুক্রবার সকালে দেখা যায় তীব্র নিরাপত্তা টানটান অবস্থা। ইসরায়েলি বাহিনী বিশেষ করে দামেস্ক গেট এবং লায়ন্স গেট এলাকায় ভারী সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করে। নামাজে আসা অসংখ্য তরুণকে আটকানো হয়, তাদের পরিচয়পত্র জব্দ করে দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।
ইসলামিক ওয়াকফ বিভাগের তথ্যমতে, অনেক তরুণ মুসল্লিকে মসজিদের মূল চত্বরে প্রবেশে বাধা দেয়া হয় এবং তারা বাধ্য হয়ে আশপাশের রাস্তায় জামাতে নামাজ আদায় করেন। এমনকি কিছু মুসল্লি পুরোনো শহরের দেয়ালের বাইরে রাস্তায় বসেই নামাজ পড়তে দেখা যায়।
শুক্রবারের নামাজে খুতবা প্রদান করেন আল-আকসার বিশিষ্ট খতিব শেখ মুহাম্মদ সালিম আল-আরব। তিনি তাঁর জোরালো বক্তব্যে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। খতিব বলেন,
“রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের আল-আকসা উত্তরাধিকার হিসেবে দিয়ে গেছেন। এটি রক্ষা করা আমাদের ঈমানের দায়িত্ব। মুসলমানদের উচিত জেরুজালেমে আগমন বাড়ানো ও পবিত্র মসজিদের মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ় ভূমিকা নেওয়া।”
তিনি আরও বলেন, “আল-আকসা আজ শুধু ইবাদতের স্থান নয়, বরং এটি মুসলমানদের আত্মসম্মানের প্রতীক। আরব ও মুসলিম বিশ্বের বিভক্তি দূর করে যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ হই, তাহলে আল্লাহর সাহায্যে এই পবিত্র ভূমি আবার মুক্ত হবে।”
কোভিড-১৯ মহামারির কারণে টানা ৬৯ দিন বন্ধ থাকার পর গত রবিবার মসজিদটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়। দীর্ঘ বিরতির পর শুক্রবারের নামাজ ছিল প্রথম বৃহৎ জামাত। মানুষজন মুখে মাস্ক ও হাতে স্যানিটাইজার নিয়ে নামাজে অংশ নিলেও তাদের মুখে ছিল অদম্য আনন্দের ছাপ।
শেখ ওমর আল-কিসওয়ানি, যিনি আল-আকসা মসজিদের পরিচালক, জানান—
“আজকের দিনটি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দখলদার বাহিনীর বাধা, মহামারির আতঙ্ক—কোন কিছুই আমাদের ঈমানকে দুর্বল করতে পারেনি। আমরা আবারও প্রমাণ করেছি, আল-আকসা আমাদের হৃদয়ে।”
গাজার যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ দখলকৃত পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমে নতুন করে সামরিক তৎপরতা জোরদার করেছে।
ফিলিস্তিনি Colonization and Wall Resistance Commission এর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে পশ্চিম তীরে ৮৯৮টি চেকপয়েন্ট ও লোহার গেট স্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে ২০২৫ সালের শুরু থেকেই নতুন ১৮টি গেট বসানো হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি জেরুজালেমে প্রবেশের অনুমতি পাননি। তাদের অনেকেই নামাজের জন্য বিশেষ পারমিটের আবেদন করলেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তা বাতিল করে। তবুও বিপুলসংখ্যক মানুষ সীমান্ত ঘিরে থাকা বাধা উপেক্ষা করে মসজিদে উপস্থিত হন।
এই শুক্রবারের নামাজে শুধু ইবাদত নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছিল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের দিন। আল-আকসা মসজিদের চত্বরে গাজা ও পশ্চিম তীরে নিহত শহীদদের জন্য জানাজা গায়েবানা সালাত অনুষ্ঠিত হয়।
মসজিদের আকাশমণ্ডলে যখন হাজার হাজার মানুষের দোয়া ধ্বনিত হচ্ছিল, তখন তা যেন গোটা দুনিয়ার মুসলিম সমাজের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
মসজিদের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রবীণ ফিলিস্তিনি বলেন,
“আমরা এখানে শুধু নামাজ পড়তে আসিনি। আমরা এসেছি জানাতে—আল-আকসা আমাদের আত্মা। আমরা এর মুক্তি না দেখা পর্যন্ত থামব না।”
শুক্রবারের এই বিশাল সমাবেশে মুসলিম বিশ্বে উচ্ছ্বাস ও উদ্বেগ—দু’টিই দেখা গেছে।
তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এই ঘটনাকে “আল-আকসা মসজিদের প্রতি মুসলমানদের অটল ভালোবাসার প্রকাশ” বলে অভিহিত করেছে।
ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ কাশিমি এক বিবৃতিতে বলেন,
“ইসরায়েল যতই বাধা দিক, মুসলমানদের হৃদয় থেকে আল-আকসার প্রতি ভালোবাসা মুছে ফেলা যাবে না।”
এই নামাজ শুধু এক ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এটি হয়ে উঠেছে এক প্রতিরোধের প্রতীক। ইসরায়েলি নিপীড়ন, রাজনৈতিক বিভাজন ও আন্তর্জাতিক নীরবতার মাঝেও আল-আকসা আজও দাঁড়িয়ে আছে অটল।
যেভাবে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে নামাজে অংশ নিলেন, তা প্রমাণ করে—আল-আকসা শুধু পাথরের গম্বুজ নয়, এটি এক জাতির আত্মা, এক বিশ্বাসের প্রতীক।
প্রায় ৫০,০০০ মুসল্লি আল-আকসা মসজিদে শুক্রবারের নামাজে অংশ নেন।
ইসরায়েলি পুলিশ কঠোর নিরাপত্তা আরোপ করে, বহুজনকে বাধা দেয়।
আল-আকসার খতিব মুসলিম ঐক্যের আহ্বান জানান।
গাজা ও পশ্চিম তীরের শহীদদের জন্য গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
দখলকৃত অঞ্চলে চেকপয়েন্ট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৯৮টি।
মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।