ঢাকা, ১৯ অক্টোবর ২০২৫: বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ভুখা মিছিল রোববার বিকেলে হাইকোর্ট মাজার গেটের সামনে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা থামিয়ে দেন। খালি থালা–বাসন হাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে শিক্ষা ভবনের উদ্দেশে রওনা দেওয়া মিছিলটি দোয়েল চত্বর পেরিয়ে হাইকোর্ট মোড়ে পৌঁছালে বাধার মুখে পড়ে। মুখোমুখি অবস্থানে কিছু সময় উত্তেজনা থাকলেও বিকাল পৌনে ৫টার দিকে শিক্ষক-কর্মচারীরা শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচিতে ফিরে যান।
শিক্ষক নেতারা জানান, সরকারের দেওয়া সর্বনিম্ন ২ হাজার টাকা বা মূল বেতনের ৫ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা প্রস্তাব তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের প্রধান দাবি—মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা থেকে ১,৫০০ টাকা করা এবং এমপিওভুক্ত কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ। এ ছাড়া সব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিও জোরালোভাবে তুলে ধরেন তারা।
মিছিলের আগে ও পরে শিক্ষক-কর্মচারীরা স্লোগান দেন—“হয়তো দাবি মেনে নে, নয়তো বুকে বুলেট দে”, “৫%–এর প্রজ্ঞাপন, মানি না, মানব না”, “ভাতা মোদের দাবি নয়, অধিকার অধিকার”, “২০% বাড়িভাড়া দিতে হবে”। শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী, এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব, শহীদ মিনারে ব্রিফিংয়ে বলেন, “সরকারের ৫ শতাংশ বাড়িভাড়া প্রস্তাব আমাদের ন্যায্যতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। চূড়ান্ত দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।” তিনি আরও জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ডাকসু ভিপি সাদিক কাইয়ুম শিক্ষকদের প্রতি সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেবেন এবং এরপর পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
মাঠপর্যায়ের একজন শিক্ষক এনামুল হক স্বপন বলেন, “আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ছি, কিন্তু নিজেরাই ন্যায্য স্বীকৃতি পাচ্ছি না। বছরের পর বছর প্রতিশ্রুতির পরও ফল পাইনি; দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকব।” মিছিলে শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো; শিক্ষক নেতাদের ভাষ্যে এতে হাজারো মানুষ অংশ নেন। ঘটনাস্থলে পুলিশের জলকামান ও সাঁজোয়া যান মোতায়েন ছিল।
সরকার গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাড়িভাড়া ভাতা প্রথম ধাপে ৫০০ টাকা বাড়িয়ে ১,৫০০ টাকা করেছিল। পরে ৫ অক্টোবর তা প্রকাশ্যে এলে শিক্ষকরা সেটি প্রত্যাখ্যান করেন। আলোচনার ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার মূল বেতনের ৫% বা সর্বনিম্ন ২,০০০ টাকা বাড়িভাড়া ভাতা প্রস্তাব আসে; কিন্তু শিক্ষক সংগঠনগুলো সেটিও মানেনি। তাদের যুক্তি, ৫%–এর প্রস্তাব বাস্তবে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং স্কেলভেদে চরম বৈষম্য তৈরি করছে।
প্রেক্ষাপট: ১২ অক্টোবর প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থানকালে শিক্ষক–পুলিশের ধস্তাধস্তি ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের পরদিন থেকে শিক্ষকরা লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করেন। মঙ্গলবার সচিবালয় অভিমুখে লংমার্চে পুলিশ বাধা দেয়; বুধবার তারা শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। বৃহস্পতিবার ঘোষিত ‘মার্চ টু যমুনা’ শেষ মুহূর্তে স্থগিত হলেও রোববার ফের এই কর্মসূচির ঘোষণা এল; যদিও তা শেষ পর্যন্ত আয়োজন করা হয়নি। বিকেলে তারা শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি বজায় রাখেন।
সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ: প্রস্তাবিত ৫% ও দাবিকৃত ২০% বাড়িভাড়ার মধ্যে পার্থক্য উল্লেখযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ, কোনো শিক্ষকের মূল বেতন যদি ৩০,০০০ টাকা হয়, ৫% হলে ১,৫০০ টাকা, আর ২০% হলে ৬,০০০ টাকা—অর্থাৎ ৪,৫০০ টাকার তফাৎ। সরকারের ‘সর্বনিম্ন ২,০০০’ প্রস্তাব নিম্নস্কেলের জন্য স্বস্তি আনতে পারে, কিন্তু মধ্য ও উচ্চ স্কেলে ২০%–এর তুলনায় এটি যথেষ্ট কম, ফলে আন্দোলন অব্যাহত থাকার ইঙ্গিতই মিলছে। শিক্ষকদের চিকিৎসা ভাতা ১,৫০০ টাকা করার দাবি ও কর্মচারীদের ৭৫% উৎসব ভাতা নির্ধারণের প্রস্তাব দ্রুত বিবেচনায় না আনলে শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার ঝুঁকি থেকে যায়।
আরও পড়ুন:হেফাজতে ইসলাম: জামায়াতে ইসলামী নিয়ে আমিরের মন্তব্য ব্যক্তিগত, সংগঠন অরাজনৈতিক