বাংলাদেশের পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন—মূল ধারাগুলো কী বলে?—এই প্রশ্নটি সাম্প্রতিক আইন প্রয়োগের প্রেক্ষাপটে আবারও সামনে এসেছে। ২০১২ সনের ৯ নং আইনটি ৮ মার্চ ২০১২ থেকে কার্যকর হয় এবং নৈতিক–সামাজিক অবক্ষয় রোধে পর্নোগ্রাফি উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রচারকে কঠোরভাবে দমন করার বিধান দেয়। নিচে আইনটির প্রধান ধারা ও কার্যপ্রক্রিয়ার সারসংক্ষেপ উপস্থাপিত হলো।
আইনের নাম পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২; প্রণয়ন-সঙ্গে-সঙ্গেই কার্যকর হয়। আইন বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, “শিরোনাম ও কার্যকারিতা অংশ আইন প্রয়োগে অবিলম্বতা নিশ্চিত করে,” যা নীতিনির্ধারকদের জরুরি উদ্দেশ্যকে ফুটিয়ে তোলে।
আইন অনুযায়ী পর্নোগ্রাফি বলতে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী অশ্লীল সংলাপ, অভিনয় বা নগ্ন/অর্ধনগ্ন নৃত্য—যা চলচ্চিত্র, ভিডিও, অডিও-ভিজ্যুয়াল, স্থিরচিত্র বা গ্রাফিকসে ধারণযোগ্য এবং কোনো শৈল্পিক বা শিক্ষাগত মূল্য নেই—তাকে বোঝায়। অশ্লীল বই, সাময়িকী, ভাস্কর্য, কার্টুন, লিফলেটও এর আওতায় পড়তে পারে। উৎপাদন বা প্রদর্শনের সরঞ্জাম—যেমন ক্যামেরা, কম্পিউটার, সিডি/ডিভিডি, মোবাইল, অপটিক্যাল/ম্যাগনেটিক ডিভাইস ইত্যাদি—আইনি সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত।
এই আইন কার্যকর থাকাকালে পর্নোগ্রাফি বিষয়ে অন্যান্য আইনের ওপর প্রাধান্য পায়। উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, বহন, সরবরাহ, ক্রয়-বিক্রয়, ধারণ বা প্রদর্শন—সবই নিষিদ্ধ। আইনজীবীদের মতে, “বাজারজাতকরণ থেকে ব্যক্তিগত সংরক্ষণ—সব পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় দমনমূলক কাঠামোটি সর্বব্যাপী হয়েছে।”
অপরাধ তদন্তে এসআই বা সমমর্যাদার কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকবেন। সাধারণত ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার লক্ষ্য; প্রয়োজনে উর্ধ্বতন অনুমোদনে অতিরিক্ত ১৫ দিন এবং আদালতের অনুমতিতে আরও ৩০ দিন সময় বৃদ্ধি করা যায়। তল্লাশিতে জব্দ ডিভাইস/ডাটা আদালতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। পাশাপাশি, প্রয়োজন অনুযায়ী বিটিআরসি, মোবাইল অপারেটর ও আইএসপি-র তথ্য আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
স্বীকৃত কারিগরি বিশেষজ্ঞ বা সরকারি/স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের বিশেষজ্ঞ মতামত আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা যাবে। সাইবার অপরাধ অনুসন্ধানে এটি একটি বিস্ফোরক (প্রভাবশালী) সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত।
উৎপাদন/চুক্তি/প্রলোভনে অংশগ্রহণ করানো/গোপনে ধারণ: সর্বোচ্চ ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ২ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড।
সামাজিক মর্যাদাহানি/ভয়ভীতি/অর্থ বা সুবিধা আদায়/মানসিক নির্যাতন: সর্বোচ্চ ৫ বছর ও ২ লক্ষ টাকা।
ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসে সরবরাহ: সর্বোচ্চ ৫ বছর ও ২ লক্ষ টাকা।
প্রদর্শনের মাধ্যমে গণউপদ্রব: সর্বোচ্চ ২ বছর ও ১ লক্ষ টাকা।
বিক্রয়/ভাড়া/বিতরণ/প্রচার/সংরক্ষণ/বিজ্ঞাপন বা উদ্যোগ: সর্বোচ্চ ২ বছর ও ১ লক্ষ টাকা।
শিশুপর্নোগ্রাফি: সর্বোচ্চ ১০ বছর ও ৫ লক্ষ টাকা।
সহায়তাকারী/অংশীদার: একই দণ্ডে দণ্ডিত।
ধর্মীয় উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত বা ব্যবহৃত পুস্তক, অঙ্কন, প্রতিমা বা স্বাভাবিক শিল্পকর্ম—এসব ক্ষেত্রে আইন প্রযোজ্য নয়। বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন, “এ ধারাটি রাষ্ট্রধর্মীয় অনুশীলন ও বৈধ শিল্পচর্চা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ভারসাম্য আনে।”
অপরাধগুলো আমলযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য। বিচার ফৌজদারী কার্যবিধি অনুসারে; সরকার প্রজ্ঞাপনে বিশেষ আদালত/ট্রাইব্যুনাল নির্ধারণ করতে পারে। রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের অধিকার রয়েছে।
মিথ্যা মামলা বা হয়রানিমূলক অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তি সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড ও ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনে বিধি প্রণয়ন করতে পারে। আইনের আসল (Authentic) ইংরেজি পাঠ প্রকাশের নির্দেশ আছে; বাংলা ও ইংরেজি পাঠের মধ্যে বিরোধ হলে বাংলা পাঠ প্রাধান্য পাবে।
আরও পড়ুন:বাংলাদেশি পর্ন-তারকা যুগল গ্রেপ্তার: বান্দরবন থেকে ‘বিস্ফোরক’ অভিযানে আটক
One thought on "পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন—মূল ধারাগুলো কী বলে? ‘কঠোর’ বিধানের জরুরি ব্যাখ্যা"