দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না মৃত্যুর মিছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মঙ্গলবারের (২১ অক্টোবর) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর মশাবাহিত এই রোগে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ২৫৩ জনে।
একই সময়ে, নতুন করে ৮১৪ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে এ বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬১ হাজার ৬০৫ জনে পৌঁছেছে, যা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পরিস্থিতি গত কয়েকদিন ধরেই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মঙ্গলবারের এই আপডেটের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ সোমবারের (২০ অক্টোবর) বুলেটিনেও চারজনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছিল। সেদিন মৃতের মোট সংখ্যা ছিল ২৪৯। সোমবার একদিনে ৯৪২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, যা মঙ্গলবারের তুলনায় কিছুটা বেশি ছিল।
সোমবার মারা যাওয়া চারজনই ছিলেন পুরুষ, যাদের বয়স যথাক্রমে ৬৫, ৪০, ৭০ ও ৩২ বছর। এই প্রবণতা মঙ্গলবারের পরিসংখ্যানেও প্রতিফলিত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, নতুন আক্রান্ত ৮১৪ জনের মধ্যে ৫৬৯ জনই পুরুষ, আর নারী রয়েছেন ২৪৫ জন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরুষদের সাধারণত কাজের তাগিদে বেশি সময় বাইরে থাকতে হয়, ফলে তাদের মশা বাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
রাজধানী ছাপিয়ে ডেঙ্গুর বিস্তার দেশজুড়ে
এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি সবচেয়ে আশঙ্কার দিকটি হলো এর দেশব্যাপী বিস্তার। মঙ্গলবারের তথ্যে দেখা যায়, নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ভর্তি হয়েছেন ২৭৭ জন (ঢাকা উত্তর সিটিতে ১৭০ ও ঢাকা দক্ষিণে ১০৭)। কিন্তু এর চেয়েও বেশি, অর্থাৎ ৫৩৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগে।
এর মধ্যে বরিশাল বিভাগে ১২৬ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১১২ জন, ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলায় (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১২৪ জন, খুলনা বিভাগে ৪১ জন, ময়মনসিংহে ৪৬ জন, রাজশাহীতে ৪০ জন এবং রংপুরে ৪১ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। সিলেট বিভাগেও পাঁচজনের ভর্তির খবর পাওয়া গেছে।
এই দেশব্যাপী বিস্তারের চিত্রটি সোমবারের মৃত্যুর তথ্যেও স্পষ্ট। সেদিন মারা যাওয়া রোগীদের একজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, একজন বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, একজন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং অপরজন বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এই তথ্য প্রমাণ করে, ডেঙ্গু এখন আর কেবল রাজধানীর রোগ নয়, বরং এটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, যা গ্রামীণ ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে।
হাসপাতালগুলোতে চাপ, ২০২২-কে ছোঁয়ার পথে মৃত্যু
একদিকে যেমন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে হাসপাতাল থেকে রোগীরা সুস্থ হয়ে বাড়িও ফিরছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৮১৯ জন রোগী ছাড়পত্র পেয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর মোট সুস্থ হয়েছেন ৫৮ হাজার ৫২১ জন। বর্তমানে সারাদেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে মোট ৩ হাজার ৮৩১ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তবে হাসপাতালে ভর্তির এই তীব্র স্রোত, বিশেষ করে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর কঠোর চাপ সৃষ্টি করছে। চলতি অক্টোবর মাস এখনো শেষ না হলেও, ২০ অক্টোবর পর্যন্তই ১৩ হাজার ৪৪৯ জন আক্রান্ত ও ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে সেপ্টেম্বর মাস ছিল চলতি বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ মাস, যখন ১৫ হাজার ৮৬৬ জন আক্রান্ত এবং ৭৬ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। আগস্ট মাসেও আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৪৯৬। এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি মৌসুমের শেষেও ডেঙ্গুর তীব্রতার জানান দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর তথ্য সংরক্ষণ করছে। সেই রেকর্ডে ২০২৩ সাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। ওই এক বছরেই ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং প্রাণ হারিয়েছিলেন ১ হাজার ৭০৫ জন।
সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার তুলনায় চলতি বছর (২০২৫) আক্রান্তের সংখ্যা (৬১,৬০৫) এখনো কম মনে হলেও, মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। চলতি বছরের ২৫৩ জনের মৃত্যু এরই মধ্যে ২০২১ সালের মোট মৃত্যুর (১০৫ জন) দ্বিগুণেরও বেশি। আশঙ্কার বিষয় হলো, এটি ২০২২ সালের মোট মৃত্যুর (২৮১ জন) খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বছর শেষ হওয়ার আগেই যদি ২০২২ সালের মৃত্যুর রেকর্ড ভেঙে যায়, তবে তা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদী ব্যর্থতাকেই প্রমাণ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জরুরি হেল্পলাইন
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে লোকাল হেলথ বুলেটিন
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমী রোগ নয়, এটি সারা বছরের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে এডিস মশার প্রজনন সারা বছরই ঘটছে। তারা কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে বলছেন, “হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামলানোর পাশাপাশি ডেঙ্গুর উৎস, অর্থাৎ এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে সর্বাত্মক ও জরুরি পদক্ষেপ না নিলে এই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হওয়া ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।”