ডেস্ক রিপোর্ট:
সিলেট/ঢাকা, ২৩ অক্টোবর, ২০২৫: একটি নতুন, মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের গৃহীত সংস্কারগুলো অপরিহার্য হলেও এই উদ্যোগ আশানুরূপ গতি পায়নি। খোদ প্রধান উপদেষ্টার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা তার সহযোগী এবং আমলাতন্ত্র সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে পারেনি।
বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) সিলেটে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রাক-নির্বাচনী আঞ্চলিক পরামর্শ সভায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। একই দিনে, ঢাকায় ভিন্ন এক অনুষ্ঠানে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় একটি নির্বাচিত সরকারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
সিলেটের সভায় ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “যে আগ্রহ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রণয়ন, টাস্কফোর্স গঠনসহ বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা আশানুরূপ গতি পায়নি।” তিনি মনে করেন, এই সংস্কার উদ্যোগ ধরে রাখতে রাজনৈতিক নতুন সরকারের উদ্যোগ থাকা জরুরি।
তিনি বলেন, “নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে ও বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের জায়গাতে নিয়ে যেতে হলে এই সংস্কারগুলো অপরিহার্য। আমরা মনে করি, আগামী দিনে রাজনৈতিক ইশতেহারে এসব প্রতিশ্রুতিকে স্থান দিতে হবে। নতুন সরকার আসলে এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।”
‘চামচা পুঁজিবাদ’ ও সংস্কার বিরোধী জোট
দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণ বিশ্লেষণ করে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অতীতের সব সরকারের আমলেই দেশে ‘চামচা পুঁজিবাদী’ অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই পুঁজিবাদে কিছু “চামচা” তৈরি হয়, যারা দেশে “লুটপাটতন্ত্র ও চোরতন্ত্র” কায়েম করেছে এবং রাষ্ট্রের পুরো কাঠামোকে এই কাজে ব্যবহার করেছে।
তিনি বিস্ফোরক মন্তব্য করে বলেন, “তারা সবসময়ই সংস্কার বিরোধী। সংস্কার প্রণয়ন করা যত সহজ, বাস্তবায়ন করা তত সহজ নয়।” তিনি মনে করেন, এই ‘সংস্কার বিরোধী জোট’ ভাঙতে হলে নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
ড. দেবপ্রিয় আরও বলেন, অতীতে এদেশে কেবল দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে। স্কুল-কলেজের ইমারত হয়েছে, কিন্তু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। একটি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিলো যা কেবল দৃশ্যমান বিভিন্ন প্রকল্প নিতে সাহায্য করেছিলো।
আরও পড়ুন:বাংলাদেশের সংস্কার কমিশন
তিনি সরকারকে স্বচ্ছতার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সংস্কার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই সরকার কিছু কাজ করেছে, কিছু করতে পারেনি। এখন যে সময়টুকু আছে, তাদের বলা উচিত ‘আমরা চলে যাওয়ার আগে কী-কী করে যাব’। সেই স্বচ্ছতাটাই আমরা প্রস্তাব করছি।”
তিনি বর্তমান সময়কে ‘রূপান্তরকালীন’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “এখনকার সরকার অন্তবর্তীকালীন, কিন্তু সময়টা রূপান্তরকালীন। গতকাল থেকে দেখছি যে এই সরকারকে আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মুডে নিয়ে যেতে হবে। সেটাতে গেলে সংস্কারের কাজ আরও ঢিলা হয়ে যাবে।”
সভায় অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অতীতের রাজনৈতিক দলগুলো অনেক আশ্বাস দিলেও তার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। তবে তিনি পরিবর্তনের আশা প্রকাশ করে জানান, সবার মতামত নিয়ে একটি ‘নাগরিক মেন্যুফেস্টো’ তৈরি করা হবে।
উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় নির্বাচিত সরকার চান মির্জা ফখরুল
অন্যদিকে, একই দিনে (বৃহস্পতিবার) রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভিন্ন সুরে কথা বলেন। তিনি দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন।
‘মহাকালের মহানায়ক শহীদ জিয়া’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি অভিযোগ করেন, “কিছু রাজনৈতিক দল পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বিলম্বিত করার চেষ্টা করছে, যা দেশের গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।”
সংস্কারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সংস্কারের মধ্য দিয়েই বিএনপির জন্ম। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেছিলেন। দেশের যত ভালো উদ্যোগ ও উন্নয়ন হয়েছে, তার অধিকাংশই বিএনপির হাত ধরে এসেছে।”
তিনি আরও বলেন, জিয়াউর রহমান ছিলেন এক ক্ষণজন্মা নেতা এবং জাতি গঠনে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকার ইতিহাস থেকে তার নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিকে যখন নাগরিক সমাজ ও অর্থনীতিবিদরা অন্তবর্তীকালীন সরকারের অধীনে গভীর অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছেন, অন্যদিকে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানাচ্ছে। এই দুই চাওয়ার মধ্যে ভারসাম্য রেখেই বাংলাদেশকে এগোতে হবে।