মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে শুরু হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় আঞ্চলিক জোট আসিয়ান (ASEAN)-এর ৪৭তম শীর্ষ সম্মেলন। তিন দিনব্যাপী এ বৈঠক চলবে আগামী মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) পর্যন্ত।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও এবারের আসিয়ান চেয়ার আনোয়ার ইব্রাহিম রবিবার উদ্বোধনী অধিবেশনের মাধ্যমে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বলেন, “আসিয়ানের মূল ভিত্তি হলো অন্তর্ভুক্তি ও স্থায়িত্ব। এই ঐক্যের মধ্য দিয়েই আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও টেকসই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া গড়তে পারি।”
সম্মেলনে যোগ দিতে কুয়ালালামপুরে এসেছেন প্রায় দুই ডজন বিশ্বনেতা।
এদের মধ্যে রয়েছেন—
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প,
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং,
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ,
জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি,
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে–মিউং,
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লুক্সন,
রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেক্সান্দার নোভাক,
এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (ভার্চুয়ালি অংশ নিচ্ছেন)।
এ ছাড়া ব্রাজিল, কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকার নেতাসহ বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, আইএলও এবং ফিফা-এর প্রধানরাও সম্মেলনে উপস্থিত আছেন।
আসিয়ান এখন ১১টি দেশ নিয়ে গঠিত একটি জোট — ব্রুনেই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও সদ্য যুক্ত হওয়া পূর্ব তিমুর।
দেশগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ৬৮ কোটি এবং জিডিপি প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলার।
এবারের সম্মেলনে পূর্ব তিমুরকে পূর্ণ সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়—যা দেশটির জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
এবারের সম্মেলনে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা হচ্ছে, যেমন:
মিয়ানমার সংকট ও ‘পাঁচ দফা ঐকমত্য’-এর বাস্তবায়ন অগ্রগতি,
দক্ষিণ চীন সাগরে নিরাপত্তা ও আচরণবিধি চূড়ান্তকরণ,
মার্কিন-চীন প্রতিযোগিতার মধ্যে আসিয়ানের ঐক্য রক্ষা,
গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আসিয়ানের যৌথ অবস্থান,
ডিজিটাল ইকোনমি ফ্রেমওয়ার্ক ২০২৬ সালের মধ্যে কার্যকর করার লক্ষ্য,
এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ ও সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিশীলতা।
এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ‘এশিয়া জিরো এমিশন কমিউনিটি’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা চলছে।
আরো পড়ুনঃ ডোনাল্ড ট্রাম্প এর কড়া সতর্কতা
সম্মেলনের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায়, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া দীর্ঘ সংঘাতের পর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেন এবং দুই দেশের নেতারা তার প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই চুক্তি টেকসই শান্তির চেয়ে রাজনৈতিক প্রদর্শনীর দিকেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
২০২১ সাল থেকে চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে এবারও মিয়ানমারের কোনো প্রতিনিধি আসিয়ান সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না।
ফলে আসন্ন বছরের আসিয়ান চেয়ারম্যানশিপ মিয়ানমারের পরিবর্তে ফিলিপাইন গ্রহণ করবে।
সমালোচকেরা বলছেন, ২০২১ সালের আসিয়ান ‘পাঁচ দফা ঐকমত্য’ ঘোষণার পরও মিয়ানমার পরিস্থিতিতে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।
আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের সহসভাপতি চার্লস সান্তিয়াগো বলেন,
“মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এখন পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সদস্যদেশগুলোকে বাধ্য করার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় আসিয়ান কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়।
তবে ইতিহাসবিদরা বলেন, এটি আসিয়ানের জন্মলগ্নের স্বাধীন কাঠামোরই ফল।
কারণ, আসিয়ান গঠিত হয়েছিল স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার ভিত্তিতে।
৪৭তম আসিয়ান সম্মেলন একদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ঐক্যের প্রতীক,
অন্যদিকে এটি বিশ্ব শক্তিগুলোর প্রভাব বলয়ে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করারও একটি মঞ্চ হয়ে উঠেছে।
আসিয়ান কি এবার তার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে মিয়ানমারসহ আঞ্চলিক সংকটগুলোর বাস্তব সমাধানে পৌঁছাতে পারবে—
এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।