তাজিকিস্তানের আইনি বিমানঘাঁটি থেকে ভারতের সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে এক যুগেরও বেশি সময়ের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। দীর্ঘদিন গোপনে চলা এই প্রক্রিয়া এখন প্রকাশ্যে এসেছে। প্রশ্ন উঠছে—ভারতের জন্য এই সিদ্ধান্তের অর্থ কী, এবং মধ্য এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এর প্রভাব কতটা গভীর?
আইনি বিমানঘাঁটি ছিল বিদেশে ভারতের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাঁটি। এটি তাজিকিস্তানের একটি কৌশলগত স্থানে অবস্থিত, যা আফগানিস্তানের ওয়াখান করিডর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে।
এই করিডর ঘিরে রয়েছে তিন পরাশক্তির স্বার্থ—চীন, পাকিস্তান এবং রাশিয়া।
২০০২ সালে তাজিকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে ভারত এই ঘাঁটির সংস্কার শুরু করে। প্রায় ৮ কোটি ডলার ব্যয়ে রানওয়ে, হ্যাঙ্গার, জ্বালানি ডিপো এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম তৈরি করে ভারত। এ ঘাঁটি ব্যবহার করে ভারত আফগানিস্তানে তালেবান বিরোধী শক্তি নর্দার্ন অ্যালায়েন্সকে সহায়তা করেছিল।
চুক্তির মেয়াদ ২০২২ সালে শেষ হয়। তাজিকিস্তান রাশিয়া ও চীনের কূটনৈতিক প্রভাবের কারণে ভারতের সঙ্গে চুক্তি নবায়নে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে।
ভারত বুঝতে পারে, রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সেখানকার উপস্থিতি ধরে রাখা কঠিন। ফলে তারা ধীরে ধীরে নীরবে সেনা ও সরঞ্জাম সরিয়ে নেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভারতের জন্য একটি কৌশলগত পশ্চাদপসরণ, যা মধ্য এশিয়ায় ভারতের সামরিক উপস্থিতিকে সীমিত করে দেবে।
আইনি বিমানঘাঁটির মাধ্যমে ভারত শুধু তাজিকিস্তানে নয়, বরং পুরো মধ্য এশিয়ায় কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছিল।
এই ঘাঁটি ছিল ভারতের জন্য আফগানিস্তান, পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর এবং চীনের শিনজিয়াং প্রদেশের কাছাকাছি নজরদারির সুযোগ।
এখন ঘাঁটি হারিয়ে ভারতের জন্য:
আফগানিস্তান সংক্রান্ত গোয়েন্দা কার্যক্রম কঠিন হবে,
চীনের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পর্যবেক্ষণ সীমিত হবে,
এবং মধ্য এশিয়ায় ভারতের সামরিক প্রতীকী উপস্থিতি প্রায় শেষ হয়ে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও চীনের কূটনৈতিক প্রভাব তাজিকিস্তানকে ভারত-বিমুখ করেছে।
একইসঙ্গে পাকিস্তানও এই অঞ্চলে চীনের সঙ্গে মিলে নতুন সামরিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ জোরদার করছে।
তাজিকিস্তান–চীন সীমান্তে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) প্রকল্পও ভারতের জন্য আরেক বড় উদ্বেগের কারণ।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে এখন মূল প্রশ্ন—বিদেশে সামরিক উপস্থিতি না থাকলে কৌশলগত ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব?
ভারত ইতিমধ্যে কিছু দেশ (যেমন ওমান, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ)-এর সঙ্গে সামরিক সহায়তা চুক্তি করেছে, কিন্তু এগুলো পূর্ণাঙ্গ ঘাঁটি নয়।
আইনি ঘাঁটি হারানো মানে ভারতের জন্য একটি কৌশলগত শূন্যতা, বিশেষ করে চীন–পাকিস্তান অক্ষের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মুখে।
তাজিকিস্তানের আইনি বিমানঘাঁটি হারানো ভারতের জন্য শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও একটি বড় ধাক্কা।
এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে—যেখানে মধ্য এশিয়ায় সরাসরি উপস্থিতির বদলে ভারতকে কূটনৈতিক অংশীদারিত্ব ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় জোর দিতে হবে।