বাংলাদেশের রাজনীতিতে চার দশকেরও বেশি সময় সক্রিয় উপস্থিতি রাখা এবং দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হলেন। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় দায়ীর প্রমাণ পাওয়ার পর সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করে। দেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ ধরনের শাস্তি এই প্রথম।
রায়ে শেখ হাসিনার পাশাপাশি তাঁর সরকারের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আর মামলার অপর আসামি সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে দেওয়া হয়েছে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।
৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছাড়েন এবং ভারতে অবস্থান করছেন। পলাতক থাকায় এই রায়ের বিরুদ্ধে তাঁর আপিলের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলিরা।
মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়। সেগুলো হলো—
উসকানিমূলক বক্তব্য
আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা
চানখাঁরপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা
আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যা
ট্রাইব্যুনাল-১ এর তিন সদস্যের বেঞ্চ সব অভিযোগেই প্রমাণ পেয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ প্রমাণিত হওয়ায় উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগে তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং হত্যাসংক্রান্ত অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এ মামলায় একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি ছিলেন পুলিশপ্রধান চৌধুরী আল–মামুন। তিনি দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।
জবানবন্দিতে তিনি জানান, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ‘লেথাল উইপন’ ব্যবহারের নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। সেই নির্দেশনা আসে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে।
এ কারণে তাঁর শাস্তির মাত্রা কমানো হয়েছে।
সাড়ে চার শ পৃষ্ঠার রায়ের সারাংশ আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে পড়ে শোনান বিচারকরা। শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামানসহ অনেক আইনজীবী।
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর এজলাসে হাততালি দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন কয়েকজন উপস্থিত ব্যক্তি, যদিও আদালত শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পরে সতর্ক করা হয়।
রায় ঘোষণার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে উল্লাস দেখা যায়। বিএনপি রায়কে ‘ন্যায়বিচার’ বলেছে, আর জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের গড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি বলেছে ‘এটাই উপযুক্ত বিচারের ফল’।
অন্যদিকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা আগে থেকেই এই রায়কে ‘সাজানো’ বলে দাবি করছিলেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন,
“যে ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে, পৃথিবীর যেকোনো আদালতে একই ফল হতো।”
রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের ব্যক্তিগত সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিহতদের পরিবার এবং আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও রয়েছে।
রায়ের দিন সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় সেনা, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির কঠোর নিরাপত্তা ছিল। নিহতদের পরিবার, আহতরা এবং আইনজীবীসহ অনেকে রায় শুনতে সরাসরি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।